
দুবেলা, সীমিত কুমার সেন: গণতন্ত্রের উৎসব কি তবে গ্রাস করেছিল অন্ধকারের শক্তি? দক্ষিণ ২৪ পরগনার ফলতা বিধানসভা কেন্দ্রের বুথভিত্তিক রিপোর্ট খতিয়ে দেখার পর এমনই চাঞ্চল্যকর ইঙ্গিত দিল ভারতের নির্বাচন কমিশন। ২৯ এপ্রিলের ভোটগ্রহণে স্বচ্ছতার লেশমাত্র ছিল না, এই মর্মে কার্যত নজিরবিহীন সিদ্ধান্ত নিয়ে গোটা ফলতা বিধানসভা কেন্দ্রেই পুনর্নির্বাচনের নির্দেশ দিয়েছে কমিশন। আগামী ২১ মে ফের লাইনে দাঁড়াবেন এই কেন্দ্রের ভোটাররা। কমিশনের পর্যবেক্ষণে স্পষ্ট ভাষায় জানানো হয়েছে, ভোট প্রক্রিয়া সম্পূর্ণভাবে ‘vitiated’ বা কলুষিত হয়েছে।
নির্বাচন কমিশনের পেশ করা বিস্তারিত রিপোর্টে উঠে এসেছে এক হাড়হিম করা তথ্য। ২৯ এপ্রিল ভোটগ্রহণের দিন বুথ থেকে বুথে যে অনিয়ম চলেছে, তা কেবল বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং এক সুপরিকল্পিত ছক বলেই মনে করছে ওয়াকিবহাল মহল। সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগ উঠেছে ভোটারদের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ নিয়ে। কমিশন জানিয়েছে, ১৬০, ২২৫, ২৪৫ এবং ২২৪ নম্বর বুথে ‘কম্প্যানিয়ন ভোটিং’-এর নামে চলেছে প্রহসন। ভোটারের পরিবর্তে তাঁর হয়ে ভোট দিয়ে দিয়েছেন তাঁর তথাকথিত ‘সঙ্গী’। ২২৪ নম্বর বুথে তো দেখা গিয়েছে এক ব্যক্তি সারাদিন ধরে অন্যের হয়ে বোতাম টিপে গিয়েছেন।
এখানেই শেষ নয়, ১৮২ নম্বর বুথে ধরা পড়েছে ‘ফলস ভোটিং’-এর অভিযোগ। কমিশনের কাছে খবর, সেখানে একজন মহিলা ও দুই পুরুষ দীর্ঘ সময় ধরে অন্যের পরিচয় দিয়ে ভুয়ো ভোট দিয়ে গিয়েছেন। ২৩২, ২৪৭ এবং ২৩৫ নম্বর বুথে একই ভোটিং কম্পার্টমেন্টে একসঙ্গে একাধিক ব্যক্তির প্রবেশের দৃশ্য ধরা পড়েছে ভিডিওতে। নিয়ম ভেঙে একই ব্যক্তিকে বারবার কম্পার্টমেন্টে ঢুকতে দেখা গিয়েছে, যা স্রেফ বেআইনি নয়, বরং ভয় দেখানোর নামান্তর।
ভোটের স্বচ্ছতা প্রমাণের প্রধান হাতিয়ার হলো ভিডিও ফুটেজ। কিন্তু ফলতায় সেই অস্ত্রকেই অকেজো করে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। কমিশনের নথিতে বুথ ৭৮, ৮০, ১৪৪, ১৬০, ২২৭, ২২৮, ২২৯, ২৩৩, ২৩৪, ২৩৫, ২৩৬ এবং ২৩৭ নম্বরে ভোটগ্রহণের কোনও সম্পূর্ণ ভিডিও পাওয়া যায়নি। রেকর্ডিংয়ের মাঝে বড় বড় ‘গ্যাপ’ বা ফাঁক থাকার কারণে কমিশন নিশ্চিত হতে পারেনি যে সেখানে সত্যিই ভোট হয়েছে নাকি বুথ দখল। ভিডিও উধাও হওয়ার তালিকাটি দীর্ঘ ও সন্দেহজনক। ২২৯ নম্বর বুথে ভোট শুরুর সময় থেকে বিকেল ৩টে ৪১ মিনিট পর্যন্ত কোনও দৃশ্য নেই। ২৩০ নম্বর বুথে সকাল ১১টা থেকে দুপুর ২টো ৩০ পর্যন্ত ফুটেজ উধাও। আবার ২৩৫ নম্বর বুথেও নির্দিষ্ট গুরুত্বপূর্ণ সময়ের ফুটেজ পাওয়া যায়নি। ১৭৭ এবং ২২৬ নম্বর বুথে দীর্ঘক্ষণ ক্যামেরা বন্ধ করে রাখার অভিযোগ উঠেছে। এমনকি ১০, ৭৬, ৭৭, ৯৯, ১০০, ১১৮, ১৩৮, ১৪০, ১৪৬, ১৫৬, ১৬৫, ১৮৬, ১৯৩ এবং ২১৮ নম্বর বুথে বিকেল ২টো থেকে রাত ৮টা ৪৫ পর্যন্ত কোনও ভিডিও রেকর্ডিং না থাকায় সেখানে ভোটারদের বাধা দেওয়া হয়েছিল কি না, তা যাচাই করা কমিশনের পক্ষে অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে।
যাঁদের উপর সুষ্ঠু ভোট করানোর দায়িত্ব ছিল, সেই পোলিং কর্মীদের ভূমিকাও এখন স্ক্যানারে। ১৪৪, ২২৭ এবং ২৩১ নম্বর বুথে পোলিং অফিসাররা বারবার ভোটিং কম্পার্টমেন্টে ঢুকে ভোটারদের নির্দেশ দিয়েছেন—যা নির্বাচনী বিধির চরম লঙ্ঘন। এছাড়াও ২৩৮ থেকে ২৬১ নম্বর বুথ পর্যন্ত এলাকায় বহিরাগত এবং অননুমোদিত ব্যক্তিদের অবাধ বিচরণ ছিল বলে রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে। পোলিং অফিসারদের উপস্থিতিতেই এই অনিয়ম হওয়ায় তাঁদের নিরপেক্ষতা প্রশ্নের মুখে। ফলতায় ভোটের আগে আইনশৃঙ্খলা রক্ষার জন্য অজয় পাল শর্মার মতো দুঁদে আধিকারিককে নিয়োগ করা হয়েছিল। কিন্তু তাঁর নজরদারিতেও কী ভাবে ১৬১ এবং ১৬৩ নম্বর বুথে সেক্টর অফিসারের কার্যকলাপ ভিডিও থেকে বাদ পড়ে গেল, তা নিয়ে প্রশাসনিক মহলে জোর চর্চা শুরু হয়েছে। সেক্টর অফিসারের দেওয়া রিপোর্ট এবং আসল ঘটনার মধ্যে বিস্তর ফারাক পাওয়ায় ষড়যন্ত্রের গন্ধ পাচ্ছে বিরোধী শিবির। কমিশনের সিদ্ধান্ত ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, মাঠপর্যায়ে নজরদারিতে চরম গাফিলতি ছিল এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থার সঠিক প্রয়োগ হয়নি।
কমিশনের ঘোষণা অনুযায়ী, ২১ মে সকাল ৭টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত পুনর্নির্বাচন হবে। আগামী ৪ মে ফলতা বিধানসভার ফলাফল ঘোষিত হবে না, বদলে ২৪ মে নতুন করে গণনা করা হবে। তবে এলাকাবাসীর মনে একটাই বড় প্রশ্ন যে ২১ মে কি সত্যিই নিরাপদে ভোট দেওয়া যাবে? কমিশন সূত্রে খবর, এই দফায় ফলতায় অতিরিক্ত কেন্দ্রীয় বাহিনী পাঠানো হবে, প্রতি বুথে মাইক্রো-অবজার্ভার থাকবেন এবং ভিডিওগ্রাফির উপর কড়া নজরদারি করা হবে।
ফলতায় পুনর্নির্বাচন কেবল একটি আইনি প্রক্রিয়া নয়, এটি হারানো জনমত পুনরুদ্ধারের এক কঠিন পরীক্ষা। যে কেন্দ্রে পোলিং অফিসার থেকে শুরু করে সেক্টর অফিসার পর্যন্ত সকলের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে, সেখানে নির্বাচন কমিশন স্বচ্ছতা ফেরাতে কতটা সফল হয়, এখন সেটাই দেখার। ভোটারদের বুথমুখী করতে প্রশাসনের পক্ষ থেকে আস্থার বাতাবরণ তৈরি করাই হবে আগামী কয়েক দিনের প্রধান চ্যালেঞ্জ।

প্রতিমুহূর্তের খবর পেতে লাইক করুণ II দুবেলা নিউজ
