দুবেলা, সীমিত কুমার সেন: দীর্ঘ ১৫ বছরের রাজনৈতিক সমীকরণ বদলে গিয়ে পশ্চিমবঙ্গের ক্ষমতার অলিন্দে শুরু হতে চলেছে এক নতুন অধ্যায়। শনিবার, ৯ মে ২০২৬, এই দিনটিকেই বাংলার রাজনৈতিক ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ মোড় হিসেবে দেখা হচ্ছে, কারণ এই প্রথমবার ভারতীয় জনতা পার্টির কোনও নেতা পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শপথ গ্রহণ করতে চলেছেন। সদ্য সমাপ্ত বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপির নিরঙ্কুশ জয়ের পর রাজ্যের রাজনৈতিক মানচিত্রে যে বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত মিলেছিল, এবার তা বাস্তবে রূপ নিতে চলেছে।
নতুন সরকার শপথ নেওয়ার আগে, অর্থাৎ ৮ মে ২০২৬ পর্যন্ত রাজ্যের প্রশাসনিক দায়িত্ব সাংবিধানিক নিয়ম মেনে রাজ্যপাল R. N. Ravi এর তত্ত্বাবধানে থাকবে। বিধানসভা ভেঙে দেওয়ার পর অন্তর্বর্তীকালীন এই পরিস্থিতিকেই এখন কেন্দ্র করে জোর রাজনৈতিক আলোচনা শুরু হয়েছে রাজ্যজুড়ে।
রাজভবন সূত্রে জানা গিয়েছে, রাজ্যপাল ভারতের সংবিধানের ১৭৪(২)(খ) অনুচ্ছেদের অধীনে ক্ষমতা প্রয়োগ করে পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা আনুষ্ঠানিকভাবে ভেঙে দিয়েছেন। এর ফলে ২০২১-২০২৬ মেয়াদের বিধানসভার কার্যকাল শেষ হয়ে নতুন সরকার গঠনের সাংবিধানিক পথ সম্পূর্ণরূপে পরিষ্কার হয়ে গেল। ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপি (Bharatiya Janata Party) নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেছে। বিভিন্ন রাজনৈতিক সূত্র অনুযায়ী, ২৯৪ আসনের মধ্যে বিজেপি স্পষ্ট সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়েছে। অন্যদিকে, দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকা All India Trinamool Congress বড় ধাক্কার মুখে পড়েছে।

বিদায়ী মুখ্যমন্ত্রী (Mamata Banerjee)-র নেতৃত্বাধীন সরকারের মেয়াদও এর মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকভাবে শেষ হল। যদিও রাজনৈতিক মহলে এখনও জোর চর্চা চলছে নির্বাচনের ফলাফল এবং পরবর্তী রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে। তৃণমূল কংগ্রেসের পক্ষ থেকে ভোট প্রক্রিয়া নিয়ে একাধিক প্রশ্ন তোলা হয়েছে বলে রাজনৈতিক সূত্রের দাবি। এদিকে, নির্বাচনের ফল প্রকাশের পর থেকেই রাজ্যের রাজনৈতিক আবহ ক্রমশ উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে। বিজেপি নেতৃত্ব দাবি করেছে, বাংলার মানুষ পরিবর্তনের পক্ষে রায় দিয়েছে এবং দুর্নীতি, রাজনৈতিক হিংসা ও প্রশাসনিক ব্যর্থতার বিরুদ্ধে ভোট দিয়েছে। অন্যদিকে তৃণমূল কংগ্রেসের পক্ষ থেকে নির্বাচনী প্রক্রিয়া নিয়ে আপত্তি তোলা হয়েছে।
এই আবহের মধ্যেই বৃহস্পতিবার কলকাতায় এসে মুখ্যমন্ত্রী Mamata Banerjee-র সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন সমাজবাদী পার্টির প্রধান Akhilesh Yadav। সূত্রের খবর, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বাসভবনে হওয়া ওই বৈঠকে তিনি তৃণমূল নেত্রীকে উত্তরীয় পরিয়ে শুভেচ্ছা জানান এবং রাজনৈতিকভাবে পাশে থাকার আশ্বাস দেন। বৈঠকের পর রাজনৈতিক মহলে সবচেয়ে বেশি চর্চিত হয়েছে অখিলেশ যাদবের একটি মন্তব্য। রাজনৈতিক সূত্র অনুযায়ী, তিনি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে উদ্দেশ্য করে বলেন, “দিদি, আপনি হারেননি।” তাঁর এই মন্তব্যকে বিজেপির বিপক্ষে বিরোধী রাজনৈতিক ঐক্যের বার্তা হিসেবেই দেখছে রাজনৈতিক মহলের একাংশ।
অন্যদিকে, নতুন সরকার গঠন নিয়ে জোর প্রস্তুতি শুরু করেছে বিজেপি। দলীয় সূত্রে খবর, খুব শীঘ্রই বিধায়ক দলীয় বৈঠক ডেকে মুখ্যমন্ত্রী পদপ্রার্থী নির্বাচন করা হতে পারে। এরপর রাজ্যপাল সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের নেতাকে সরকার গঠনের আমন্ত্রণ জানাবেন। রাজনৈতিক মহলের অনুমান, ৯ মে-ই নতুন মুখ্যমন্ত্রীর শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হতে পারে। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে এটি এক ঐতিহাসিক পালাবদল। ২০১১ সালে বামফ্রন্ট সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করে তৃণমূল কংগ্রেস ক্ষমতায় আসে। তারপর টানা তিন দফা সরকার চালানোর পর ২০২৬ সালের নির্বাচনে দলটি বড় ধাক্কা খেল। অন্যদিকে বিজেপি প্রথমবারের মতো বাংলার ক্ষমতার কেন্দ্র দখলের পথে এগিয়ে গেল।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই পরিবর্তনের ফলে শুধু প্রশাসনিক কাঠামো নয়, কেন্দ্র-রাজ্য সম্পর্কের ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব পড়তে পারে। গত এক দশকে রাজ্য সরকার ও কেন্দ্রের মধ্যে একাধিক বিষয়ে সংঘাত তৈরি হয়েছিল। এখন বিজেপি ক্ষমতায় এলে সেই সমীকরণে বড় পরিবর্তন আসতে পারে বলেই মনে করছে রাজনৈতিক মহল। সব মিলিয়ে, ২০২৬ সালের মে মাস পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি তাৎপর্যপূর্ণ সময় হিসেবে চিহ্নিত হতে চলেছে। বিধানসভা ভেঙে যাওয়ার মাধ্যমে যেমন তৃণমূল কংগ্রেস সরকারের দীর্ঘ অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটল, তেমনই বাংলায় প্রথম পূর্ণাঙ্গ বিজেপি সরকারের পথও আনুষ্ঠানিকভাবে খুলে গেল।

প্রতিমুহূর্তের খবর পেতে লাইক করুণ II দুবেলা নিউজ
