প্রিন্স বনাম কিং: নরেন্দ্র মোদি স্টেডিয়ামে কোহলিদের হারিয়ে দাপুটে জয় গুজরাট টাইটান্সের

Spread the love

Simit Kumar Sen

দুবেলা, সীমিত কুমার সেন: নামটা যেন গল্পের মতো, “কিং বনাম প্রিন্স”। একদিকে আধুনিক ক্রিকেটের ‘রাজা’ বিরাট কোহলি, অন্যদিকে নতুন প্রজন্মের ‘রাজপুত্র’ শুভমন গিল। কিন্তু নরেন্দ্র মোদি স্টেডিয়ামের আলো ঝলমলে রাতে শেষ হাসিটা হাসল গুজরাট টাইটান্স। চার উইকেটে জয় তুলে নিয়ে চলতি আইপিএলে রয়্যাল চ্যালেঞ্জার্স বেঙ্গালুরুর বিরুদ্ধে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দিয়ে দিল গিলের দল।

ম্যাচের শুরুটা কিন্তু একেবারেই অন্য গল্প বলছিল। টস জিতে প্রথমে বল করার সিদ্ধান্ত নেয় গুজরাট টাইটান্স। ফলে ব্যাট করতে নেমে আরসিবি আত্মবিশ্বাসী সূচনা করে। দেবদত্ত পাডিক্কাল ও বিরাট কোহলি, দু’জনেই শুরু থেকেই আক্রমণাত্মক মেজাজে ছিলেন। পাডিক্কাল ২৪ বলে ৪০ রানের ঝরঝরে ইনিংস খেলেন, যেখানে ছিল টাইমিং আর ক্লাসের মিশেল। অন্যদিকে কোহলি ১৩ বলে ২৮ রান করে আবারও প্রমাণ দিলেন, তাঁর পুরোনো ফর্ম এখনও অটুট। কিন্তু ক্রিকেটের খেলায় গতি বদলাতে সময় লাগে না। এই ম্যাচেও ঠিক তাই হল। কোহলি ও পাডিক্কালের আউট হওয়ার পর যেন হঠাৎ করেই ভেঙে পড়ে আরসিবির ব্যাটিং লাইনআপ। রাজত পাটিদার (১৯) কিছুটা চেষ্টা করলেও, বড় ইনিংস গড়ে তোলার মতো দায়িত্ব কেউই নিতে পারেননি। একের পর এক উইকেট পড়তে থাকে, আর স্কোরবোর্ডে চাপ বাড়তে থাকে।

গুজরাটের বোলিং ইউনিট এই জায়গাটাতেই ম্যাচে নিজেদের প্রভাব বিস্তার করে। জেসন হোল্ডার ছিলেন একেবারে নিখুঁত, তিনি ৪ ওভারে ২৯ রান দিয়ে ২ উইকেট, সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ সময়ে ব্যাট হাতে ১২ রান। তাঁর অলরাউন্ড পারফরম্যান্সই ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। রশিদ খান তাঁর স্বভাবসিদ্ধ কৌশলে মিডল ওভারে রান আটকান এবং ২ উইকেট তুলে নেন। আরশাদ খানও যথেষ্ট কার্যকরী ছিলেন।  ফলে নির্ধারিত ২০ ওভারের আগেই ১৯.২ ওভারে ১৫৫ রানে গুটিয়ে যায় আরসিবি। স্কোরটা খুব বড় না হলেও, এই পিচে লড়াই করার মতো ছিল। তবে ম্যাচের গতি ইতিমধ্যেই অনেকটাই গুজরাটের দিকে ঝুঁকে পড়েছিল। ১৫৬ রানের লক্ষ্যে ব্যাট করতে নেমে গুজরাট টাইটান্স শুরু থেকেই ইতিবাচক মনোভাব দেখায়। অধিনায়ক শুভমন গিল ১৮ বলে ৪৩ রানের ঝকঝকে ইনিংস খেলেন। তাঁর ব্যাটে ছিল আত্মবিশ্বাস, টাইমিং এবং আধিপত্যের ছাপ, যেন তিনি নিজের রাজত্ব প্রতিষ্ঠা করতে নামছেন। শুভমন গিলের এই দ্রুত রান তোলাই ম্যাচের ভিত গড়ে দেয়।

জস বাটলারও ১৯ বলে ৩৯ রান করে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। মিডল অর্ডারে কিছুটা ধাক্কা এলেও, রাহুল তেওয়াটিয়া শেষ পর্যন্ত দায়িত্ব নিয়ে ম্যাচ শেষ করেন। ১৭ বলে অপরাজিত ২৭ রান করে তিনি আবারও প্রমাণ করলেন, চাপের মুহূর্তে তিনি কতটা নির্ভরযোগ্য। আরসিবির বোলিংয়ে ভুবনেশ্বর কুমার ছিলেন একমাত্র উজ্জ্বল দিক। ৪ ওভারে ২৮ রান দিয়ে ৩ উইকেট তুলে নিয়ে তিনি গুজরাটকে কিছুটা চাপে ফেলেছিলেন। কিন্তু অন্য প্রান্ত থেকে সেই সমর্থন পাননি। জশ হ্যাজলউড, রোমারিও শেফার্ড কিংবা সুয়াশ শর্মা. কেউই ম্যাচে বড় প্রভাব ফেলতে পারেননি। ফলে গুজরাট ১৫.৫ ওভারে ৬ উইকেট হারিয়ে সহজেই লক্ষ্য পূরণ করে ফেলে।

এই জয়ের ফলে গুজরাট টাইটান্স প্লে-অফের দৌড়ে নিজেদের অবস্থান আরও মজবুত করল। অন্যদিকে, ২০২৫ সালে প্রথম আইপিএল ট্রফি জয়ের পর এবারের মরশুমে বেশ আত্মবিশ্বাসী দেখালেও, আরসিবির জন্য এটি তৃতীয় পরাজয়। দলটির ব্যাটিং গভীরতা ও মিডল অর্ডারের স্থিরতা নিয়ে প্রশ্ন উঠতেই পারে। সব মিলিয়ে, নরেন্দ্র মোদি স্টেডিয়ামের এই লড়াইটা ছিল কেবল একটা ম্যাচ নয়, এটা ছিল দুই প্রজন্মের প্রতীকী সংঘর্ষ। যেখানে অভিজ্ঞতার ‘রাজা’ কোহলি নিজের ছাপ রাখলেও, শেষ পর্যন্ত জয় তুলে নিলেন নতুন যুগের ‘রাজপুত্র’ শুভমন গিল। ক্রিকেটে রাজত্ব চিরস্থায়ী নয়, প্রতিদিনই নতুন কেউ এসে নিজের দাবি জানায়। আর এই ম্যাচ যেন সেই সত্যিটাই আবার মনে করিয়ে দিল।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *