সোনার প্রতি ভালোবাসাই কি ভারতের অর্থনীতির বড় বিপদ?

Spread the love
Simit Kumar Sen
Simit Kumar Sen

দুবেলা, সীমিত কুমার সেন: ভারতের অর্থনীতিতে নতুন করে উদ্বেগ বাড়াচ্ছে সোনা। মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতি, হরমুজ প্রণালীর অনিশ্চয়তা এবং আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের মূল্য বৃদ্ধির পাশাপাশি এ বার স্বর্ণ আমদানিও দেশের বৈদেশিক মুদ্রার ভাঁড়ারে বড় চাপ তৈরি করছে। সেই কারণেই সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী অপ্রয়োজনীয় খরচ কমানো, বিদেশ ভ্রমণে সংযম এবং নতুন করে সোনা কেনায় ‘সাময়িক বিরতি’র ইঙ্গিত দিয়েছেন।

অর্থনীতিবিদদের মতে, বিষয়টি শুধু সাধারণ আর্থিক পরামর্শ নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে ভারতের বাণিজ্য ঘাটতি, টাকার অবমূল্যায়ন এবং মার্কিন ডলারের বৈশ্বিক আধিপত্য। ভারত বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ স্বর্ণ আমদানিকারক দেশ। অথচ দেশের নিজস্ব স্বর্ণ উৎপাদন কার্যত নেই বললেই চলে। ফলে চাহিদার প্রায় সম্পূর্ণটাই বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়। ২০২৬ অর্থবর্ষে ভারতের স্বর্ণ আমদানির পরিমাণ পৌঁছেছে প্রায় ৭২ বিলিয়ন ডলারে। একই সময়ে অপরিশোধিত তেল আমদানির বিল দাঁড়িয়েছে প্রায় ১৩৫ বিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ শুধু তেল ও সোনা। এই দুই খাতেই ভারতের ২০০ বিলিয়ন ডলারের বেশি বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় হচ্ছে।

এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে দেশের বাণিজ্য ঘাটতিতে। চলতি অর্থবর্ষের এপ্রিল মাসেই ভারতের ট্রেড ডেফিসিট বেড়ে প্রায় ২৮.৪ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, সমস্যা হল সোনা এমন একটি সম্পদ যা উৎপাদনশীল অর্থনীতিতে প্রত্যক্ষ ভূমিকা রাখে না। মানুষ যখন ব্যাংক, শিল্প বা শেয়ার বাজারে বিনিয়োগ না করে ভৌত সোনা কিনছেন, তখন সেই অর্থ কার্যত অর্থনীতির মূল স্রোত থেকে বেরিয়ে যাচ্ছে। স্বর্ণ আমদানির জন্য বিপুল পরিমাণ ডলার প্রয়োজন হয়।

ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে ডলারের চাহিদা বাড়ে এবং ভারতীয় টাকার ওপর চাপ তৈরি হয়। টাকা দুর্বল হলে তেল, ভোজ্যতেল, সার ও ইলেকট্রনিক পণ্যের মতো আমদানিকৃত দ্রব্যের দাম বেড়ে যায়। অর্থনীতিবিদরা একে বলছেন “গোল্ডেন প্যারাডক্স”। মানুষ মূল্যস্ফীতির ভয়ে সোনা কেনেন, কিন্তু সেই সোনা কেনাই আবার মূল্যস্ফীতি আরও বাড়িয়ে তোলে। ভারতের এই সংকটের কেন্দ্রে রয়েছে মার্কিন ডলারের বৈশ্বিক আধিপত্য। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ১৯৪৪ সালের ব্রেটোন উডস চুক্তির মাধ্যমে বিশ্বের অধিকাংশ মুদ্রাকে ডলারের সঙ্গে যুক্ত করা হয়। পরে ১৯৭৪ সালে সৌদি আরবের সঙ্গে মার্কিন চুক্তির ফলে তেল শুধুমাত্র ডলারে বিক্রি শুরু হয়।

এর ফলে পৃথিবীর প্রতিটি দেশকে তেল কিনতে ডলার জোগাড় করতেই হয়। বিশেষজ্ঞদের একাংশের দাবি, ডলার এখন শুধু অর্থনৈতিক শক্তি নয়, আমেরিকার অন্যতম ভূ-রাজনৈতিক অস্ত্র। ইরাক, লিবিয়া বা ইরানের মতো দেশ ডলারের বাইরে গিয়ে তেল বাণিজ্যের চেষ্টা করতেই আন্তর্জাতিক চাপের মুখে পড়েছিল। যদিও এই তত্ত্ব নিয়ে বিতর্ক রয়েছে, তবুও “পেট্রোডলার ওয়ার থিওরি” আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে বহুল আলোচিত। বর্তমানে চীন, রাশিয়া ও ব্রিকস জোট ডলারের বিকল্প ব্যবস্থা তৈরির চেষ্টা করছে। চীন ইতিমধ্যেই ইউয়ানে তেল কেনার উদ্যোগ শুরু করেছে। একই সঙ্গে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্কও দ্রুত হারে স্বর্ণ কিনছে।

শুধু কর বাড়িয়ে সোনার চাহিদা কমানো সম্ভব নয়। কারণ ভারতে সোনা শুধু বিনিয়োগ নয়, একটি আবেগ, একটি নিরাপত্তার প্রতীক, বহু পরিবারের ভবিষ্যতের ভরসা। কিন্তু যে সোনা এক সময় ভারতীয় ঘরের সুখ-সমৃদ্ধির চিহ্ন ছিল, সেই সোনাই আজ দেশের অর্থনীতির জন্য নীরব উদ্বেগ হয়ে উঠছে। সাধারণ মানুষের সঞ্চয়ের ঝলমলে গয়নার আড়ালে তাই ধীরে ধীরে স্পষ্ট হয়ে উঠছে এক গভীর অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার ছায়া।

Like Dubela News to get up to the minute news.

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *