দুবেলা, সুদর্শন পালঃ আজ জীবনের শেষ পর্বে এসে ১৯শে মে এর স্বতঃস্ফূর্ত ভাষা আন্দোলনের একাদশ শহীদদের গুলি বিদ্ধ হওয়ার ঘটনা আজ আমার মনকে আন্দোলিত করছে। সেই মর্মান্তিক ঘটনা আজ ইতিহাসে পরিণত হয়েছে। আর এই ইতিহাসের प्रत्यक्ष সাক্ষী হিসেবে আজও আমি বেঁচে আছি। আমার সঙ্গের অনেকে আজ নেই। আজ যারা সেই ভাষা শহীদ দিবস উদযাপন করেন হয়তো সেসময় তাদের জন্মই হয়নি। তাই তাদের উদ্দেশ্যে সেই বাস্তব ঘটনার চিত্রটি তুলে ধরার যথাসাধ্য চেষ্টা করছি। যদিও আমার পক্ষে সে চেষ্টাও খুব সহজবোধ্য নয়। একে বয়সের ভার তার উপর দেহ বিকল হাত কাঁপছে। কম্পিত হাতেই লিখার প্রয়াস করছি।
বছরটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। ১৯৬১ রবীন্দ্র জন্ম শতবার্ষিকী। আর এই বছরই আসামে বাড়ানোর ভাষা রক্ষার গণ আন্দোলন। সম্পূর্ণ বাঙ্গালী অধ্যুসিত এই বরাক উপত্যকাই এই আন্দোলনের কেন্দ্র হয়ে উঠেছিল। কারণ সরকারের কঠোর দমন নীতি এবং উগ্র আঞ্চলিকতাবাদের হিংসার শিকার হয়ে ব্রহ্মপুত্র উপত্যকার বাঙালীদের অকথ্য অত্যাচার ভোগ করতে হয়েছিল। তাই ব্রহ্মপুত্র উপত্যকার বাঙালীর একমাত্র ভরসার জায়গা হয়ে উঠেছিল এই বরাক উপত্যকা। পরিতোষ পাল চৌধুরীর হাত ধরে সূচনা হয়েছিল সত্যাগ্রহী আন্দোলন। আন্দোলন ধাপে ধাপে এগিয়েছিল আর সত্যাগ্রহীর সংখ্যা বাড়ছিল। সরকারের শাসন যন্ত্র আন্দোলন বানচালের যথেচ্ছ প্রয়াস করেছিল। বেছে বেছে অগ্রণী ভূমিকা সত্যাগ্রহীদের জেলে আটক করে রাখা হতে লাগল। পরিতোষ পাল চৌধুরী আত্মগোপন করে সহকারী নেতৃত্বের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করে চলেছিলেন। সরকারী দমন নীতি উপেক্ষা করে দিকে দিকে এমন কি গ্রামে গ্রামে পর্যন্ত গণ জাগরণ সৃষ্টি হয়েছিল। শিলচর-হাইলাকান্দি-করিমগঞ্জ একই পরিকল্পনায় আন্দোলনের কর্মসূচী পালন করে চলছিল। এমনি এলো উনিশের চরম রূপরেখা। রেল অবরোধ সহ সরকারী সব কার্যক্ষেত্রকে অচল করে দেওয়ার পরিকল্পনা।
তখন আমরা গুরুচরণ কলেজের ছাত্র। সে সময় যে কোন আন্দোলনে গুরুচরণ কলেজের ছাত্র সংস্থার ভূমিকা ছিল উল্লেখযোগ্য। স্বাভাবিকভাবে প্রায় সব ছাত্র-ছাত্রীই প্রত্যক্ষভাবে বা পরোক্ষভাবে তাতে জড়িত থাকত। তাই এর মধ্যে অনেকেই সত্যাগ্রহী সদস্যভুক্ত হয়েছিল। তবে সেদিন প্রায় সবাই অঘোষিত সত্যাগ্রহীতে পরিণত হয়ে গিয়েছিল। শহরের সবদিকে গণজাগরণ ছড়িয়ে পড়েছিল। পূর্ব পরিকল্পিত রূপরেখা অনুযায়ী শহরে ১৯ শে মে-এর কর্মসূচীর কার্যকর করার তৎপরতা শুরু হল। ভোর পাঁচটার মধ্যে সত্যাগ্রহীরা নিজ নিজ দায়িত্ব অনুযায়ী নিজ নিজ নির্দিষ্ট স্থানে পৌঁছে গেল। অফিস আদালত রেল স্টেশন। তবে সেদিন রেল অবরোধই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ছিল। তাই রেলস্টেশনেই সর্বাধিক সত্যাগ্রহী ছিল। ছিল অঘোষিত সত্যাগ্রহীর বিরাট সমাবেশ। সঙ্গে শহরের জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত সহযোগিতা।
আমাদের পূর্ব পরিকল্পনা অনুযায়ী আমরা ছয়-সাত জন বন্ধু সকাল সাতটার মধ্যে রেল স্টেশনে গিয়ে পৌঁছলাম। পিছনের দিকে-জলের ট্যাঙ্কের নীচে আমাদের জায়গা করে নিলাম। ভোরের দিকে অল্প একটু বৃষ্টি হয়েছিল। ধীরে ধীরে আকাশ পরিষ্কার হয়ে গেল। রোদ বৃষ্টি মাথায় নিয়ে সবাই আছে। সামনে লাইনের উপর বসা সত্যাগ্রহী জনতা। পিছনের দিকে অনেক দাঁড়ানো। সবার আগে প্রতিরোধ। পুলিশ-লাঠিধারী সি.আর.品.এফ বন্দুকধারী আসাম ব্যাটেলিয়ান। পরিবেশ প্রতিক্রিয়াধীন। শান্ত আস্তে আস্তে সূর্য পশ্চিম আকাশে সরে যাচ্ছে। তবে রোদের বেশ তেজ আছে। তখন বেলা প্রায় চারটা হবে আমাদের পিছন দিক থেকে ঘোষণা করা হচ্ছে- বন্ধুগন আমাদের আন্দোলন শান্তিপূর্ণভাবে শেষ হতে চলছে। আপনারা আরো একটু ধৈর্য….
ঘোষণা পূর্ণ হওয়ার আগেই শান্তিতে অশান্তির আগুন জ্বলে উঠল। আচমকা বন্দুকের আওয়াজ। গুলি বর্ষণ আরম্ভ হয়েছে। আমরা যেখানে দাঁড়িয়ে ছিলাম সেখানে জলের ট্যাঙ্কের লোহার এঙ্গেলের গায়ে গুলি লেগে ঠং-ঠং শব্দ হচ্ছে। আমার বন্ধু রঘু (শান্তনু হোম চৌধুরী) আমাকে বলল- মাটিতে শুয়ে পড়। তারপর আমার পাশের বন্ধুরা সব অদৃশ্য। আমি হতভম্ভ। মাটিতে শুয়ে পড়তে পারলাম না। দেখলাম সি.আর.পি.এফ বেপরোয়া লাঠি চালিয়ে আমাদের দিকে আসছে। আমি তাড়াতাড়ি ছোট দুটি ঘরের মাঝখানের সরু ফাঁক দিয়ে কোন রকমে ঘরের পিছনে চলে গেলাম। দেখলাম রেলের বিরাট পুকুরে জলেও কিছু লোক পড়ে আত্মরক্ষা করছে। এর পর আমার ডানদিকে একটু দূরে আরেকটি ছোট ঘরের পিছনে এক তরুণী দাঁড়িয়ে আছে। পরনে শাড়ী (তখন চুড়িদার ও প্যান্টের প্রচলন ছিল না)। ওর চোয়াল বেয়ে দর দর করে রক্ত ঝরছে। তাড়াতাড়ি দৌড়ে গেলাম ওর কাছে। চোয়াল ঘেঁষে গুলির চিহ্ন। রুমাল দিয়ে ওর ক্ষতস্থান চেপে ধরলাম। তারপরই দেখি সি.আর.পি.এফ আমাদের দিকে আসছে। তাড়াতাড়ি ডানদিকে পুকুরের কোনায় অনুচ্চ প্রাচীর পেরিয়ে যাওয়ার জন্য মেয়েটিকে নিয়ে ছুটলাম।
প্রাচীরের কাছে যেতেই স্বেচ্ছা সেবকরা আমার হাত থেকে মেয়েটিকে তুলে নিয়ে চলে গেল। শুধু মেয়েটি নয়, এভাবে একের পর এক নিয়ে যাচ্ছে। কে আহত কে নিহত বোঝা যাচ্ছে না। আমার তা দেখার বা বোঝার অবস্থা ছিল না। পরিবেশ ছিল ভীষণ ব্যস্ত। আমি উদ্ধার কার্যে ব্যস্ত, ভীড়ের দৌড় ঝাপের মধ্যে দিয়ে তারাপুরের সদর রাস্তায় উঠে এলাম। তখন আমার চোখে পড়ল আমার গায়ের সাদা হাফ শার্টের পুরো সামনের দিকটা রঙে লাল। সদররাস্তা থেকে সতীন্দ্র মোহন দেবের বাড়ী পর্যন্ত লোকে লোকারণ্য। ওখানে আহত নিহতদের রাখা হচ্ছে। হুল্লা চিৎকারের মধ্যে আমার কানে এলো দুটি নাম। শচীন্দ্র পাল এবং কমলা ভট্টাচার্য। এরা নিহত শহীদ হয়েছে। আমি সঙ্গীহীন ভীড়ের মধ্যে একা। কিছু করার নেই। অম্বিকাপট্টি বাড়ীর দিকে পা বাড়ালাম। রেল স্টেশনের রাস্তার পর থেকে ভীড় ক্রমশঃ অনেক কম। তারপর রাস্তা একেবারে ফাঁকা, কিন্তু রোদ ভরা। ফায়ার-ব্রিগেড স্টেশন অতিক্রম করার সময় দেখলাম দু’জন লোক রেল স্টেশনের দিকে হন-হন করে হেঁটে আসছেন। একজন দীর্ঘ ঋজু দেহ বর্ষীয়ান বিরাট ব্যক্তিত্ব সম্পন্ন লোকমান্য ব্যক্তি। পরনে সাদা ধুতি-পাঞ্জাবী মাথায় গান্ধী টুপি। আমাদের কলেজের পরম শ্রদ্ধেয় অধ্যক্ষ যোগেন্দ্র কুমার চৌধুরী অর্থাৎ জে.কে.চৌধুরী। অপরজন তরুণ যুবক ছাত্র- মুক্তা গোস্বামী। একজন গম্ভীর দ্রুত দ্রুত বেগে অপরজন চিৎকার করে পাশাপাশি বকবক করে আমাকে অতিক্রম করে চলে গেলেন।
শুনশান রাস্তা পেরিয়ে শিল্পপটি তে প্রবেশ করতে চোখে পড়ল বাড়ীর সামনে ছোট-বড় মহিলারা বাড়ীর সামনে দাঁড়িয়ে আমার দিকে তাকিয়ে দেখছেন। তখন শিল্পপট্টি সম্পূর্ণ আবাসিক-পাড়া ছিল। তাই প্রত্যেক বাড়ীর সামনে একই দৃশ্য চোখে পড়ল। সকলের চোখ আমার দিকে আমার গায়ের জামা খুলে হাতে নিয়ে খালি গায়ে চললাম। তাতে ও রাস্তা পার্শ্ববর্তী দৃষ্টি এড়ানো গেল না। এভাবে বাকী রাস্তা পেরিয়ে অম্বিকাপট্টি বর্তমান শহীদ হিতেশ বিশ্বাস রোডে আমাদের বাড়ীতে পৌঁছলাম। আমাকে ঘিরে সকলের বিস্মিত জিজ্ঞাসা। আমার উনিশ জানালাম। বাড়ীতে আসার পথেই সান্ধ্য আইন জারী হয়ে গেছে। রাত্রেই খবর পেয়ে গেলাম এগারোটি নিষ্পাপ প্রাণ গুলিবদ্ধ হয়ে শেষ হয়ে গেছে। এগারো শহীদ। শিলচর একাদশ শহীদের শহর হয়ে গেছে। পরদিন বিকেলে সান্ধ্য আইন অমান্য করে একাদশ শহীদের শবদেহ নিয়ে মিছিল বেরোল। আমরা সব বন্ধুরা ও মিছিলে যোগ দিলাম। বিশাল মৌন মিছিল। এর আগে শিলচর এত বড় মিছিল হয়নি।
পরে রেলস্টেশনে যে ঘোষক ছিল তার দূরবস্থার কথা শুনেছিলাম। ও আমাদেরই সহপাঠী বন্ধু ছিল অরবিন্দ ধর (মানিক) ও আমাকে বলেছিল ও নাকি আমাকে মেয়েটিকে ধরে নিয়ে যেতে দেখেছে। কিন্তু তারপরই তার দূরবস্থা ঘটেছিল। সি.আর.পি.এফের তাড়ায় পায়ে জুতাসহ পুকুরে ঝাপ দিয়ে পড়ে ছিল। একবার ভাসছিল আর ডুবছিল আর ‘রক্ষা করো’ ‘রক্ষা করো’ বলে চিৎকার করছিল। আসলে এই গুলি বর্ষণের মুখ্য কারণ ছিল বাংলা এবং বাঙালী বিদ্বেষ। এরিয়ে পশ্চিমবঙ্গেও ঝড় উঠেছিল। কোলকাতা থেকে কবি সাহিত্যিক, নেতা সাংবাদিক এসে জ্বালাময়ী ভাষায় এ ঘটনার প্রতিবাদ করে গেলেন এবং পত্র-পত্রিকায় লিখলেন। এরিয়ে তদন্ত কমিশনও বসেছিল। কিন্তু রিপোর্ট আজও কালরাত্রির খামে ঢাকা পড়ে আছে।
দুবেলা নিউজকে follow করুনঃ
-
https://www.facebook.com/dubelanews
-
https://x.com/dubelanewsdesk
-
https://www.youtube.com/@DUBELANEWS
-
https://www.instagram.com/dubelanews/
- https://whatsapp.com/channel/0029VbCXdbMBKfi44784KB10

প্রতিমুহূর্তের খবর পেতে লাইক করুণ II দুবেলা নিউজ
